সবাই চাপ থেকে মুক্ত থাকতে চায়, কিন্তু প্রথমত, তুমি কি জানো চাপ কী? চাপ হলো অনেক বেশি কাজ এবং খুব কম সময় বা শক্তি। যখন আমাদের অনেক কিছু করার থাকে এবং পর্যাপ্ত সময় এবং শক্তি থাকে না, তখন আমরা চাপে পড়ে যাই। তাই হয় তুমি তোমার কাজের চাপ কমিয়ে দাও, যা আজকাল সম্ভব বলে মনে হয় না, অথবা তুমি তোমার সময় বাড়াও – এটিও সম্ভব নয়। তাই আমাদের কাছে যা অবশিষ্ট আছে তা হল তোমার শক্তির মাত্রা বৃদ্ধি করা।
শক্তি বাড়ানোর জন্য এখানে চারটি সহজ কৌশল রয়েছে:
- সঠিক পরিমাণে খাবার গ্রহণ – খুব বেশি নয় এবং খুব কমও নয়। পর্যাপ্ত কার্বোহাইড্রেট এবং প্রোটিন সহ একটি সুষম খাদ্য।
- সঠিক পরিমাণে ঘুম – 6 থেকে 8 ঘন্টা ঘুম, বেশি নয়, কম নয়।
- কিছু গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম শেখা – এটি তোমার শক্তি বৃদ্ধি করে।
- ধ্যানমগ্ন মনের কিছু মুহূর্ত। কয়েক মিনিটের গভীর শিথিলতা – সচেতন ও গভীর শিথিলতাকে আমি ধ্যান বলব। কয়েক মিনিটের ধ্যান সকল ধরনের চাপ থেকে মুক্তি দিতে পারে। যদি তুমি সকাল ও সন্ধ্যায় 15 – 20 মিনিট ধ্যান করো, তাহলে তা যথেষ্ট। এটি তোমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।
চাপকে শুরুতেই নির্মূল করো
একটি কথা আছে “যুদ্ধক্ষেত্রে তীরন্দাজী শেখা যায় না”। সেই অবস্থানে নামার আগে তোমার তীর-ধনুক চালানো শেখা উচিত। তাই, যখন তুমি চাপে ভোগো, তখন তুমি কিছু করতে পারবেনা, তবে তোমাকে আগে থেকেই কিছু করতে হবে যাতে তুমি একদম সেই স্তরে না যাও, তুমি চাপে না পড়ো। তুমি মঞ্চে নতুন সুর শিখতে পারবেনা – যদিও আমি এতে বিশ্বাস করি না, এটি একটি প্রবাদ, আসলে কিছুই অসম্ভব নয়। আমি বলব তোমার আচরণের ধরন, খাদ্যাভ্যাসের ধরন, এবং জীবনের পরিবর্তন অনুভূতিগুলো কিভাবে উপলব্ধি করো, তোমার যোগাযোগের ক্ষমতা, সমালোচনা সহ্য করার এবং সমালোচনা গ্রহণ করার ক্ষমতা … সাধারণত, জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি নিজেই একটি পার্থক্য তৈরি করে। তোমার সর্বজনীন চেতনার সঙ্গে হওয়া, তুমি কতটা সর্বজনীন চেতনার সঙ্গে সংযুক্ত, তার চেয়েও বেশি তোমার কাজ করার ক্ষমতা।

ধ্যান
তুমি জানো আজকের বিজ্ঞানীরা বলেন, যদি আমরা আট সপ্তাহ, অর্থাৎ দুই মাস ধরে দিনে দুবার 20 মিনিট ধ্যান করি, তাহলে আমাদের মস্তিষ্কের গ্রে ম্যাটার বৃদ্ধি পায় এবং মস্তিষ্কের গঠন পরিবর্তিত হয়। আমরা জানি ধ্যান আমাদের উপর প্রভাব ফেলে, কিন্তু যখন তুমি বিজ্ঞানীদের কাছ থেকেও শোনো, তখন এটা আমাদেরই প্রাচীন অভিমতকে প্রতিষ্ঠিত করে যা বিশ্বজুড়ে অনেক অনেক বছর ধরে বহু বহু মানুষ বলে আসছেন। তাই, ধ্যান গুরুত্বপূর্ণ। আজ প্রতি দুই সেকেন্ডে, আমরা এই গ্রহে ৭ জন প্রাণ হারাচ্ছি মানসিক চাপের কারণে। প্রতি দুই সেকেন্ডে সাতজন মানুষ মারা যাচ্ছে মানসিক চাপের কারণে, যা এড়ানো যেতে পারে। তাই চাপ থেকে মুক্তির উপায় হল গভীর ধ্যান। গভীর ধ্যানে আমরা চাপ থেকে মুক্তি পেতে পারি। আমরা মানুষের মুখে হাসি ফিরিয়ে আনতে পারি।
মানসিক চাপ এবং শিক্ষা
মানসিক চাপ আগ্রাসন এবং হিংস্রতার তৈরি করে, অথবা এটি হতাশা বা আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি করে। এবং এর কারণ হল কেউ আমাদের মনকে কীভাবে সামলাতে হয় তা শেখায়নি।
শিক্ষা কেবল তথ্য সংগ্রহ করা নয়, “তুমি কে?” এবং “তোমার ক্ষমতা কি?” তার জানতে শেখায়। এটি তোমার অস্তিত্বের 7টি ভিন্ন স্তর, অর্থাৎ শরীর, শ্বাস, মন, বুদ্ধি, স্মৃতি, অহংকার এবং নিজেকে জানতে শেখায়। আমরা অস্তিত্বের এই স্তরগুলি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ, তাই আমরা জানি না আমাদের মধ্যে যখন রাগ আসে তখন কীভাবে সামলাতে হয়। যেমনটি আমি বলেছি, বাড়িতে বা স্কুলে কেউ আমাদের মন এবং আমাদের আবেগকে সামলাতে শেখায় না, তাই এটি মানুষের সাথেই থাকে এবং হয় হতাশায় পরিণত হয় অথবা আগ্রাসনে পরিণত হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে যে স্কুল শিক্ষকদের একটি উল্লেখযোগ্য শতাংশ হতাশাগ্রস্ত। শিক্ষকরা যখন হতাশাগ্রস্ত হন, তখন তারা ছাত্রদের সাথে কী যোগাযোগ করবেন? তারা কেবল হতাশাই বিস্তার করে! একজন সুখী ব্যক্তি অন্যদের কাছে সুখের বার্তা পৌঁছে দেয়, একজন হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তি কেবল হতাশাই সঞ্চার করে। তাই আমাদের বাচ্চাদের অহিংসার গুরুত্ব বোঝানো উচিত – অর্থাৎ, কীভাবে অহিংস যোগাযোগ করতে হয়, এবং কীভাবে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করতে হয় এবং ধৈর্য ধরতে হয়।
আমার মধ্যে শান্তি, পৃথিবীতে শান্তি
আজকের পৃথিবীতে কী ঘটছে? যখন মানুষ চাপে থাকে, হয় তারা নিজেদের ক্ষতি করে, অথবা অন্যদের ক্ষতি করে। শুধু নিজের কথা ভেবে দেখো, যখন তুমি এত চাপে থাকো যে তুমি মানুষের উপর রাগ করো এবং এ তোমার ও তাদের ক্ষতি করে কি না? এটা কি আমাদের অভিজ্ঞতা নয়? যখন আমরা স্বাভাবিক নই, আমাদের ইন্দ্রিয় বশে নেই, তখন আমরা এমন কিছু করি যা আমাদের প্রিয়জন এবং কাছের মানুষদের ক্ষতি করে। তাই, চাপের মধ্যে আমরা নিজেদের ক্ষতি করছি এবং আমরা অন্যদেরও ক্ষতি করছি। এবং বিশ্বজুড়ে এটাই ঘটছে। তাই, সমাজে আরও সুখ আনার নৈতিক দায়িত্ব আমাদের সকলের। তুমি কি তাই মনে করো না? জীবনের উদ্দেশ্য কী? আমরা যদি আমাদের চারপাশে কেবল দুঃখ তৈরি করি, তাহলে কেন আমরা বেঁচে থাকি? আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য হল সুখ ছড়িয়ে দেওয়া। সুখের ঢেউ আনা।
সুখের রহস্য
সুখের গোপন কথা
তুমি জীবনে যাই করো না কেন, তা কিসের জন্য করো? আরো সুখ, আরো আনন্দ, আরো অনেক আনন্দ পেতে । এবং আনন্দ তখনই সম্ভব হয় যখন আমরা চাপমুক্ত থাকি আর আমাদের মধ্যে যথেষ্ট প্রজ্ঞা থাকে জীবনকে বৃহৎ পরিপ্রেক্ষিত থেকে দেখার জন্য। চাপকে এড়াতে বা চাপ এলে, তাকে সহ্য করার জন্য আমাদের জীবনে প্রজ্ঞা থাকা দরকার। চাপকে এড়ানোর জন্য আমাদের কি প্রয়োজন? প্রজ্ঞা ও বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি । এবং যে চাপ এসেছে তার মোকাবিলা করার জন্য যথাযথ পদ্ধতির প্রয়োজন । বিশেষ শ্বাস-প্রশ্বাস প্রক্রিয়া ও ধ্যান হল সেই পদ্ধতি যা আমাদের মুক্ত করে চাপের থেকে। এই পদ্ধতিটি প্রজ্ঞার জন্যও জায়গা তৈরি করতে পারে; যাতে সম্ভাব্য চাপ এড়ানো যায়, যদি তা উপস্থিত না থাকে।
মানুষের মধ্যে বিশ্বাস থাকলে যোগাযোগ হয়। বিশ্বাস ভেঙ্গে গেলে যোগাযোগও ভেঙ্গে যায় আর বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যায়। তাই পরিবারে, সম্পর্কের ক্ষেত্রে, ব্যবসায়ে বা জাতির মধ্যে—যেখানেই হোক, প্রয়োজন মাত্র তিন স্তরের যোগাযোগের । এরা হলো হৃদয় থেকে হৃদয়ে যোগাযোগ, আত্মা থেকে আত্মায় যোগাযোগ এবং মস্তিষ্ক থেকে মস্তিষ্কে যোগাযোগ। ধ্যান হলো আত্মা থেকে আত্মায় যোগাযোগ।
তোমার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাও, জীবন বদলাও
এখন জেগে ওঠার সময়, আমরা এখানে চিরকাল থাকব না। আমরা হয়ত আরও দশ-কুড়ি-তিরিশ-চল্লিশ বছর থাকব। যতদিন আমরা বেঁচে থাকব, আমরা কি আরও বেশি করে হাসতে পারব না এবং অন্যদের আরও বেশি করে হাসাতে পারব না? এটাই জীবনযাত্রার শিল্প। জীবনযাত্রার শিল্প হলো তোমার ভেতরে থাকা মহাবিশ্বের সাথে উচ্চতর শক্তির সংযোগ। আর জীবনযাত্রার শিল্প হলো সবার মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলা। জীবনযাত্রার শিল্প হলো আমাদের ভেতরে এবং আমাদের চারপাশের সাথে আমাদের চারপাশের সকলের মধ্যে নিরাপত্তার অনুভূতি জাগিয়ে তোলা।





