অনেক মানুষ খুব পরিশ্রম করে, তবুও সফল হতে পারে না। আপনি কি আপনার চারপাশে কখনও এমন মানুষ দেখেছেন? এর কারণ হলো তাদের ভেতরে একটি উপাদান অনুপস্থিত থাকে। আমাদের ভেতরে একটি কম্পন আছে, একটি নেতিবাচক কম্পন, যা অতি দুর্বল । এই নেতিবাচক কম্পন দূর করার জন্য ধ্যান অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
উদ্দীপনা
ধ্যান দেহের মধ্যে এনার্জী বাড়াতে সাহায্য করে। প্রাণশক্তি বেড়ে যায়, বুদ্ধি তীক্ষ্ণ হয়, এবং অন্যদের সঙ্গে ভাবের আদান প্রদান অনেক বেশী সৌহার্দ্য পূর্ণ হয়ে ওঠে। আমরা যে সব কথা বলি, তার উপর নিয়ন্ত্রণ আসে। মনের সংকল্পশক্তি দৃঢ হয়। এমনকি ধ্যান আপনার ভাগ্যকেও বদলে দিতে পারে!
ধ্যান আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়, আর সেই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের মাধ্যমে আপনার ব্যক্তিত্বও পরিবর্তিত হয়। আপনি আরও শান্ত,নিশ্চিন্ত, দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে ওঠেন আর একই সঙ্গে আরও দয়াবান ও সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠেন। আপনি সবকিছুকে আরও পরিষ্কারভাবে দেখতে শেখেন। মনের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পায়।
এটি মানুষের সঙ্গে আপনার যোগাযোগ-কথা, আচরণ ও বিভিন্ন পরিস্থিতিতে আপনার প্রতিক্রিয়া-এই সবকিছুই উন্নত করে।
যদি আমরা প্রতিদিন কয়েক মিনিট ধ্যান করি, তবে আমরা আমাদের ওপর যে ঈশ্বরের ভালোবাসার বর্ষণ হয় সেটা উপলব্ধি করতে পারব। জীবনে জ্ঞান, উপলব্ধি ও ভালোবাসা-এই তিনটি উপাদান অত্যন্ত জরুরি। কেউই রসকসহীন, একঘেয়ে জীবন চায় না। সবাই চায় তার জীবন রসময় হয়ে উঠুক, আর সেই রসই হল ভালোবাসা।
ধ্যান তোমার চারপাশের মানুষের সঙ্গে তোমার ভাবের আদানপ্রদানকে উন্নত করে-উন্নত করে তোমার কথা বলা, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তুমি যেভাবে কাজ করো এবং নানান পরিস্থিতিতে তোমার যা যা প্রতিক্রিয়া হয়।
– গুরুদেব শ্রী শ্রী রবিশংকর
সাফল্যের সন্ধিক্ষণ
যতক্ষণ না আমাদের ভেতরে ইতিবাচক কম্পন তৈরি হচ্ছে, বা যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা নেতিবাচক কম্পনে ভরপুর, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা ভালোবাসাকে তার আসল রূপে অনুভব করতে পারি না। ভালোবাসা তখন তার বিকৃত রূপে প্রকাশ পায়—রাগ, ঘৃণা, অস্থিরতা—এই সবের মধ্য দিয়ে। তাই মনকে কিভাবে এই বিকৃতিগুলো থেকে পরিশুদ্ধ করার যায় সেই উপায় আমাদের শেখা উচিত । একবার মন এইসব বিকৃতি থেকে মুক্ত হয়ে গেলে, জীবনের সবকিছু ঠিকঠাক হতে শুরু করে। এটি ব্যক্তিগত স্তরের পরিবর্তন।
সকালে ঘুম থেকে উঠে, কাজ শুরু করার আগে মাত্র ১০ মিনিটের জন্যে বসুন। সন্ধ্যায় দিনের কাজ শেষ করে আমরা সবাই খাবার খাই। কিন্তু ডিনারের আগে একটু বসে নিজের ভেতরে গভীরে প্রবেশ করুন, নিজের অন্তরে বিশ্রাম নিন। তাহলেই জীবনে পরিবর্তন আসতে শুরু করবে।
মনের সাহায্যে শারীরিক স্বাস্থ্যের উন্নতি
আজকের জীবনযাত্রা ও পরিস্থিতিতেও ধ্যান অত্যন্ত উপকারী। আজকের সময়ে যদি এমন কিছু থাকে যা আমাদের তৃপ্তি দিতে পারে, আমাদের কাজে সহায়তা করতে পারে-তা হলো ধ্যান এবং বিশ্বাস।
মাত্র চারটি সূত্রে মনকে স্থাপন করলেই সহজেই গভীর ধ্যানে, সমাধির অবস্থায় পৌঁছে যাওয়া যায়। এই চারটি সূত্র হলো—ঈশ্বর সর্বব্যাপী, ঈশ্বর চিরন্তন, ঈশ্বর প্রত্যেকের একান্ত আপন, এবং তিনি সর্বশক্তিমান।
আমার জন্য তিনি সবসময় আছেন-এই অনুভূতি নিয়ে যদি আমরা প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় কয়েক মিনিট নিশ্চিন্ত হয়ে ধ্যান করি, তাহলে জীবনেও একের পর এক অলৌকিক পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে আর ঘটতেই থাকে। এটিই হল বিশ্বাস। যা আছে কিন্তু চোখে দেখা যায় না-তার ওপর আস্থাই বিশ্বাস।
আজকের দিনে যদি কিছু আমাদের তৃপ্তি দিতে পারে এবং কাজে সহায়তা করতে পারে, তবে তা হলো ধ্যান ও বিশ্বাস।
– গুরুদেব শ্রী শ্রী রবিশংকর
গবেষণা বলছে, যদি আমরা টানা আট সপ্তাহ প্রতিদিন ২০ মিনিট করে দু’বার ধ্যান করি, তবে মস্তিষ্কের গ্রে-ম্যাটার বৃদ্ধি পায় এবং মস্তিষ্কের গঠন পর্যন্ত পরিবর্তিত হয়। আজ পৃথিবীতে প্রতি দুই সেকেন্ডে সাতটি প্রাণ স্ট্রেসের কারণে হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ এই ক্ষতি এড়ানো যায়। স্ট্রেস কমানোর উপায় হলো ধ্যান।
হৃদয় থেকে হৃদয়ে ভাবের আদানপ্রদান
মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস থাকলে মনের যোগ সৃষ্টি হয়। বিশ্বাস ভেঙে গেলে হৃদয়ের যোগও ভেঙে যায় এবং বিপর্যয় ঘটতে থাকে। পরিবারে, সম্পর্কে, ব্যবসায় বা দুই দেশের মধ্যে – যে ক্ষেত্রেই হোক সম্পর্ক স্থাপনের তিনটি স্তর রয়েছে মস্তিষ্ক থেকে মস্তিষ্কে , হৃদয় থেকে হৃদয়ে, আত্মা থেকে আত্মায় । ধ্যান হলো আত্মা থেকে আত্মায় সম্পর্ক স্থাপন।
আমরা কীভাবে শান্তির দূত হতে পারি
ভেতরে যদি শান্তি না থাকে, বাইরে শান্তি আসতে পারে না। ধ্যান নিশ্চিত করে অন্তরের শান্তি। আর যখন অন্তরে শান্তি থাকে, তখন বাইরের শান্তিও প্রতিষ্ঠা করা যায়। আপনি যদি হতাশ,অস্থির, বিরক্ত ,বিপর্যস্থ থাকেন, তাহলে বাইরে শান্তির পরিবেশ তৈরি করতে পারবেন না।
শান্তি শুধু কথায় আসে না-শান্তি একটি কম্পন। আপনি যখন অন্তরে গভীরভাবে ধীর,স্থির ও প্রশান্ত থাকেন, তখন আপনার শক্তি অনেকগুণ বেড়ে যায়। আপনি তখন যে কোনো জায়গায় গিয়ে শান্তির কথা বলতে পারেন। ধ্যান আপনাকে সেই অন্তর্নিহিত শক্তি দেয় এবং আপনার চারপাশে শান্তির কম্পন ছড়িয়ে দেয়। তাই শান্তির জন্য ধ্যান অত্যাবশ্যক।
ধ্যান মানুষকে বদলে অনেক উন্নত করে তোলে -তার আচরণকে বদলে অনেক ভাল করে দেয়। এটি শান্তির কম্পন ছড়িয়ে দেয়।আপনি যদি প্রত্যেকদিন ধ্যানের অভ্যেস করে থাকেন তাহলে আপনি আপনার চারপাশে ইতিবাচক ও শান্তির তরঙ্গ ছড়িয়ে দিচ্ছেন, আর এইভাবে অন্যদের মনের ওপর প্রভাব বিস্তার করছেন।
অভিশাপ দেওয়ার শক্তির প্রতি সতর্ক হন
যে ব্যক্তি ধ্যানের অভ্যাস করে, তাকে খুব সতর্ক থাকতে হয়। কখনো কাউকে অভিশাপ দেওয়া উচিত নয়। যতটা সম্ভব কথাবার্তা থেকে নেতিবাচক শব্দ বাদ রাখা উচিত।
যখন আপনি ধ্যান করেন, তখন আশীর্বাদ দেওয়ার ক্ষমতা যেমন পান, তেমনি অভিশাপ দেওয়ার ক্ষমতাও লাভ করেন। প্রথমে আসে অভিশাপ দেওয়ার শক্তি, তারপর আসে আশীর্বাদ করার ক্ষমতা। কিন্তু কয়েকটি নেতিবাচক কথা বললেই ধ্যানের মাধ্যমে অর্জিত অনেক ভালো শক্তি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই এটি মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। ধ্যান মানুষকে অত্যন্ত শক্তিশালী করে তোলে।
যুদ্ধের উৎপত্তি মানুষের মনেই হয়। কারও হৃদয়ে যখন কোনো প্রশ্ন পচে ওঠে, তখন সেটিই হিংসা ও আগ্রাসনের রূপে প্রকাশ পায়। এই হিংসা ও আগ্রাসন বাতাস থেকে আসে না; এটি মানুষের হৃদয় ও মনের মধ্য থেকেই জন্ম নেয়। প্রথমে একজন মানুষের মধ্যে শুরু হয়, তারপর পরিবারে ছড়ায়, তারপর সমাজে। এরপর তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
আমাদের এই সমস্যার মূল কারণ দেখতে হবে। যেমন রোগ আগে ছড়ায় মানুষের মধ্যে তবেই সেটা গোটা দেশে ছড়ায়। রোগ মানুষের শরীরেই জন্ম নেয়। একইভাবে যুদ্ধও মানুষের মন থেকেই শুরু হয়।
যদি মব সাইকোলজি বা জনসাধারনের মনস্তত্ত্ব বলে যদি কিছু থাকে-অর্থাৎ একজন মানুষের রাগ বহু মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে গিয়ে আক্রমনাত্মক জনগন তৈরি করতে পারে-তাহলে মব পিস বা সম্মিলিত শান্তিও সম্ভব। জনগনের হিংসা যেমন একজন বা দু’জন মানুষের মন থেকে শুরু হয়, তেমনি শান্তিও একজন মানুষের মন থেকেই শুরু হতে পারে এবং সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বিশ্ব আজ দুটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি – আগ্রাসন এবং বিষণ্নতা। কেউ আগ্রাসী হয়ে সমাজে হিংসা ছড়ায়, আর কেউ বিষণ্ন হয়ে নিজের উপরই হিংসা চালায়, যার ফলস্বরূপ আত্মহত্যা ইত্যাদি ঘটে। এই দুটি চ্যালেঞ্জের সমাধান হলো ধ্যান।





