চারটি বড় দুশ্চিন্তা
মানুষ সাধারণত চারটি বিষয় নিয়ে দুশ্চিন্তা করে – টাকা, সম্পর্ক, মানসম্মান এবং স্বাস্থ্য! এগুলো সবই একদিন চলে যাবে, তবুও তুমি এগুলো নিয়ে দুশ্চিন্তা কর।
জীবনকে বড় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখো। দশ বছর আগে তুমি কোনো একটা বিষয় নিয়ে দুশ্চিন্তা করেছিলে, কিন্তু তুমি আজও বেঁচে আছ। পাঁচ বছর আগেও দুশ্চিন্তা করেছিলে, তিন বছর আগেও করেছিলে। এই দুশ্চিন্তা তোমার কিছুই করতে পারেনি। তুমি শুধু তোমার শরীরে আরও কিছু বিষ জমিয়েছিলে। তবু জীবন তো যে করে হোক চলতেই থাকে।
কী এমন জিনিস তোমাকে বিরক্ত করছে? জেগে ওঠো এবং দেখো, সবকিছুই একদিন শেষ হয়ে যাবে। সবকিছু একদিন তার শেষপ্রান্তে পৌঁছবে। — সবকিছুই একদিন শেষ হবে এই উপলব্ধি তোমাকে মনের দুশ্চিন্তা করা স্বভাব থেকে মুক্ত করতে পারে । যখন তুমি দেখবে যে সবকিছু পরিবর্তন হচ্ছে, মিলিয়ে যাচ্ছে, তখন তুমি যেমন দৃঢ , শক্তিশালী, তেমনই নরম আর নিজের ভিতরে কেন্দ্রীভূত হয়ে উঠবে।
দুশ্চিন্তা করা অর্থহীন, কিন্তু যা তোমাকে ভাবাচ্ছে বা যা তুমি চাইছো, সেই বিষয়ে কাজ করলে তোমার উপকার হবে।কাজ করার জন্য তোমার শক্তি ও এনার্জির প্রয়োজন।আধ্যাত্মিক অনুশীলন তোমার এনার্জি ও ইতিবাচকতা বাড়াতে সক্ষম।
দুশ্চিন্তার উৎস
টাকাই কি তোমার দুশ্চিন্তার কারণ? পাখিদের দেখো, সমস্ত প্রাণীদের দেখো—তারা সবাই খাবার পায়।
প্রকৃতি সবকিছুই দেয়। প্রকৃতি এক বিশাল দাতা—তাই বিশ্বাস রাখো প্রকৃতিই তোমার প্রয়োজন মেটাবে। তোমার চেতনা একটি ক্ষেতের মতো; তুমি যে বীজ বপন করবে, সেটাই অঙ্কুরিত হবে। তুমি যদি অভাবের বীজ বপন করো, অভাবই আসবে। আর যদি বলো, “হ্যাঁ, প্রাচুর্য আছে”, তবে প্রাচুর্যই আসবে।
সম্পর্ক তোমাকে সমস্যায় ফেলে, আর তুমি ভীষণভাবে মর্মাহত হয়ে পড়ো। জেগে ওঠো এবং দেখো। সম্পর্ক শুরু হওয়ার আগেও তুমি ভালোই ছিলে—বেঁচে ছিলে, চলাফেরা করছিলে, হাসছিলে, সুখে ছিলে। যার সঙ্গে তোমার সম্পর্ক তৈরি হলো, তার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগের দিনগুলো মনে করো। জীবন তখনও ঠিক ছিল। এমনকি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরও তেমনই থাকবে। তাহলে এ নিয়ে এত মন খারাপ করার কী আছে?
সবকিছুই একদিন শেষ হবে , এই উপলব্ধি তোমাকে দুশ্চিন্তার প্রবণতা থেকে মুক্ত করতে পারে।
– গুরুদেব শ্রীশ্রী রবিশঙ্কর
তুমি কি স্বাস্থ্যের জন্য দুশ্চিন্তা করছ? তুমি নিজে নিজেকে কতটা সুস্থই বা রাখতে পারবে? তুমি যতই সুস্থ থাকো না কেন, একদিন সবকিছু শেষ হবে, আর শরীরের সঙ্গে তোমার সংযোগ শেষ হবে। এটার মানে এই নয় যে সুস্থ থাকবে না—কিন্তু বসে বসে স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা করা সম্পূর্ণ অর্থহীন।
বসে বসে স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তাভাবনা করা আর দুশ্চিন্তা করা একেবারেই নিরর্থক। যত বেশি তুমি চিন্তা করবে, তোমার স্বাস্থ্য ততই খারাপ হবে। এতে শরীরে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের পরিমাণ বাড়ে,যা আরোগ্যের গতি কমিয়ে দেয়।
তুমি যদি চাকরি পাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন হও, আর তোমার চেহারায় সে উদ্বেগ স্পষ্ট দেখা যায়— তাহলে কি কেউ তোমাকে চাকরি দেবে? কোনো নিয়োগকর্তা কি এমন কাউকে নেবে যাকে দেখলে মনে হয় সে সবসময় চিন্তিত, নিস্প্রান, ন্যমনস্ক,অখুশী, দুঃখী ?তুমি নিজে যদি নিয়োগকর্তা হও, তুমি কি এমন কাউকে চাকরি দেবে যার মধ্যে কোনো উদ্যম নেই, কোনো প্রফুল্লতা নেই, কেবল মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ? তুমি যদি ব্যবসায়ী হও আর শুধু দুশ্চিন্তা করো তাহলে কি তোমার ব্যবসাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে?
তুমি যদি অবিবাহিত হও আর জীবন সঙ্গী পেতে চাও আর তোমার মুখে যদি সারাক্ষণ দুশ্চিন্তার ছাপ থাকে তাহলে কি কেউ তোমাকে সঙ্গী হিসেবে চাইবে? তুমি নিজেই কি এমন কাউকে বেছে নেবে, যে সব সময় মলিন ও চিন্তিত? তুমি তো আনন্দে ভরপুর, উৎসাহী, প্রাণবন্ত কাউকেই বেছে নেবে,তাই না?মনে রেখো, পৃথিবীতে ৭০ লক্ষ মানুষের মধ্যে ২৫ লক্ষের বেশি তোমার বিপরীত লিঙ্গের আর সম্বন্ধ করবার উপযুক্ত বয়সের। তাহলে সঙ্গী পাওয়া নিয়ে এত দুশ্চিন্তা কেন?
দুশ্চিন্তার বিষয়ে প্রজ্ঞা
জীবনকে বড় পরিসরে দেখো। কল্পনা করো, তুমি মানসিক হাসপাতালে গেছো। সেখানে থাকা মানুষের কথা শুনো, তাদের অবস্থা দেখো আর ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দাও যে তুমি সেখানে ভর্তি হওয়া রোগী নও, তুমি কেবল একজন দর্শনার্থী।
এটাও যদি কাজ না করে, তাহলে শ্মশান বা কবরস্থানে যাও। প্রতিদিন কত মানুষ সেখানে আসে, সৎকার হয়। একদিন তোমাকেও সেখানে যেতে হবে। তাহলে দুশ্চিন্তার অর্থ কী?
তোমার জীবন যতই ভালো হোক, তুমি যতই ধনী বা বিখ্যাত বা ক্ষমতাবান হও না কেন— শেষ পর্যন্ত সবাইকেই দাহ করা হবে বা কবর দেওয়া হবে। অর্ধেক দিন শ্মশানে বসে থাকলেই দেখবে— মানুষ দেহ নিয়ে আসে, একটু কাঁদে, দাহ করে— তারপর বাড়ি ফিরে রাতের খাবার খায়। পরের দিন সকালে জলখাবারও খাবে।
শেষ পর্দা একদিন না একদিন নামবেই। তাহলে দুশ্চিন্তাই বা কেন?
কিন্তু এর মানে এই নয় যে, যেহেতু সবই একদিন শেষ হয়ে যাবে, তাই আত্মহত্যা করে ফেলতে হবে। প্রকৃতিকে তার নিজের পথে চলতে দাও। প্রকৃতির কাজে হস্তক্ষেপ কোরো না। অন্যদের জন্য সমস্যা তৈরি কোরো না, তাদের কষ্ট দিও না।
আধ্যাত্মিক অনুশীলন প্রানশক্তি বাড়ায়, তুমি কাজ করতে পারো । তোমাকে তোমার হৃদয়ের সঙ্গে, তোমার অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত হতে সাহায্য করে, যাতে তুমি মাথার মধ্যে গিয়ে আটকে না পড়ো।
– গুরুদেব শ্রী শ্রী রবিশঙ্কর
আত্মহত্যা অর্থহীন, কারণ তোমাকে আবার একই চক্রের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। আবার জন্ম নিতে হবে, আবার সব সেই একই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। বরং এখানেই সব সমাপ্ত করো এটা জেনে যে এই সবই একদিন শেষ হয়ে যাবে।
দুশ্চিন্তার প্রক্রিয়া
যখন তুমি কিছু পেতে চাও, তখন তোমার মধ্যে ইচ্ছা জন্মায়।এই ইচ্ছা পূরণের জন্য তোমাকে নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে , মনপ্রাণ দিয়ে কাজ করতে হয়।
যখন তুমি তোমার ইচ্ছা পূরণের জন্য কাজ করতে পারোনা, শুধু সেটা নিয়ে ভাবতেই থাকো— তখনই দুশ্চিন্তা জন্মায়। তোমার ইচ্ছাশক্তি আর কর্মশক্তি — এই দু’টির মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা দরকার।
চিন্তা করা সম্পূর্ণ নিরর্থক। এতে কোনো ফল পাওয়া যায় না।
কিন্তু যা তোমাকে ভাবনায় ফেলেছে বা যা তুমি চাও— তার জন্য কাজ করলেই ফল পাওয়া যায়।
আধ্যাত্মিকতা মানুষকে শক্তি দেয়— কাজ করার, এগিয়ে চলার শক্তি। আধ্যাত্মিক অনুশীলন তোমার ভেতরে প্রানশক্তি বাড়িয়ে তোলে, তাই তুমি কাজ করতে পারো। তোমাকে তোমার হৃদয়ের সঙ্গে, তোমার অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত করে— যাতে তুমি কেবল মাথার মধ্যে আটকে না থাকো।
মাথা চিন্তা করে, হৃদয় অনুভব করে। মাথা ও হৃদয়— দু’টি একসঙ্গে কাজ করতে পারে না। যখন অনুভূতি জাগে, তখন চিন্তা দুর হয়ে যায়। যদি তুমি খুব বেশি চিন্তা করো, তাহলে তোমার অনুভূতিগুলো মরে যায় তুমি শুধুই মাথার ভেতরে আটকে পড়ো। চিন্তা তোমার মন আর হৃদয়কে নিস্তেজ ও নিস্ক্রিয় করে দেয়। দুশ্চিন্তা হলো মাথার ভেতর একটা ভারি পাথরের মতো। দুশ্চিন্তা মানুষকে বেঁধে ফেলে, খাঁচার ভেতর আটকে দেয়। যখন তুমি অনুভব করো তখন তুমি চিন্তা করো না।
অনুভূতি ফুলের মতো—ওগুলো উঠে আসে, ফোটে, তারপর ঝরে যায়। অনুভূতি আসে-যায়, ভেতরে জমে থাকে না। যখন অনুভূতি প্রকাশ করা হয়, তখন মন হালকা হয়ে যায়। তুমি রাগ করলে রাগটা প্রকাশ করো— পরের মুহূর্তেই ঠিক হয়ে যাও। তুমি কষ্ট পেলে কাঁদো— তারপর স্বাভাবিক হয়ে যাও। অনুভূতি অল্প সময় স্থায়ী হয় এবং তারপর মিলিয়ে যায়। কিন্তু চিন্তা দীর্ঘ সময় ধরে তোমাকে খেয়ে ফেলে— ধীরে ধীরে পুরোটা গ্রাস করে। অনুভূতি মানুষকে স্বতঃস্ফূর্ত করে তোলে। শিশুরা অনুভব করে বলে তারা স্বতঃস্ফূর্ত।
প্রাপ্তবয়স্করা তাদের অনুভূতিকে লাগাম ধরে আটকায়— আর চিন্তা করতেশুরু করে। যে কোনো বিষয়ে বেশি চিন্তা করলে কাজ বাধাগ্রস্ত হয়; কিন্তু অনুভূতি মানুষকে কাজের দিকে এগিয়ে দেয়।





