আশঙ্কা এবং উৎকন্ঠা থেকে মুক্তি পাওয়ার তাৎক্ষণিক উপায় একমাত্র যোগাসন।
মানসিক উদ্বেগ, ভয়, আশঙ্কা – আমরা যদি আমাদের জীবনের সেই সমস্ত ঘটনাবলী যেখানে এই ধরনের ভাবাবেগগুলির অভিজ্ঞতা হয়েছে সেগুলি গণনা করতে শুরু করি তাহলে হয়তো বিফল হ’ব। পরীক্ষার ফলাফলের জন্য উৎকন্ঠা অথবা আমাদের রিপোর্ট কার্ড দেখে পিতামাতার প্রতিক্রিয়া, কর্মজীবনের প্রথম দিনে অথবা কোন ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে সন্ত্রস্ত হওয়া – আমাদের প্রত্যেককেই এইরকম মুহূর্তগুলির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। স্বল্প মাত্রায় ভয় থাকাটা স্বাভাবিক, খাদ্যে যতটা লবণ দরকার ঠিক সেই রকম, এই কারণেই প্রয়োজন যাতে আমরা শৃঙ্খলাবদ্ধ, সতর্ক ও সক্রিয় থাকতে পারি।
অসুবিধা তখনই শুরু হয় যখন এই ভয় স্থায়ী হতে থাকে এবং প্রতিদিনের জীবন যাত্রায় নিহিত হয়ে ত্রাসের সঞ্চার করে। তখন এটি উদ্বেগজনিত ব্যাধিতে পরিণত হয় – অত্যন্ত অস্বস্তিকর পরিস্থিতি, দুঃশ্চিন্তা অথবা অজানা ভয়, আর তখনই চিকিৎসার প্রয়োজন দেখা দেয় – এইরকম পরিস্থিতিতেই যোগা দুশ্চিন্তাকে জয় করতে সাহায্য করে। নয়টি যোগাসনের পদ্ধতির সাহায্যে উদ্বেগজনিত ব্যাধিকে জয় করা সম্ভব।
বিঃদ্রঃ – অ্যালোপ্যাথিক ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে; আপনি এ বিষয়ে চিকিৎসার অন্য পদ্ধতি চিন্তা করতে পারেন, যেমন – হোমিওপ্যাথি এবং আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসা।
উৎকন্ঠা জনিত ব্যাধির কিছু উপসর্গ আপনি জেনে নিন
- আপনি অস্বাভাবিক ভীত হয়ে পড়বেন, ত্রাস এবং অস্বস্তিকর পরিস্থিতি অনুভূত হবে।
- অতীতের কিছু অপ্রীতিকর ঘটনার চিন্তা আপনাকে নিয়ন্ত্রণহীন করে তুলবে।
- আপনি ঘন ঘন দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠবেন।
- আপনার বার বার হাত ধোয়ার প্রবণতা দেখা দেবে।
- হাত এবং পা অস্বাভাবিক ভাবে ঘর্মাক্ত হবে।
- ঘন ঘন শ্বাস কষ্ট হওয়ার প্রবণতা থাকবে।
যোগা কিভাবে দুশ্চিন্তাকে জয় করতে পারে?
দৈনন্দিন জীবনে প্রত্যহ যোগাসনের অভ্যাস আপনাকে শান্ত ও নিরুদ্বেগ রাখতে সাহায্য করবে এবং অস্থিরতাকে বর্জন করে বিভিন্ন ধরনের ঘটনার সম্মুখীন হওয়ার শক্তি প্রদান করবে। যোগাভ্যাসে সংযোজিত রয়েছে বিভিন্ন প্রকার আসন (দেহ ভঙ্গিমা) , প্রাণায়াম (শ্বাসের বিভিন্ন প্রক্রিয়া) , ধ্যান এবং প্রাচীন যোগের দর্শন। এগুলি বিভিন্ন মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীদের সুস্থ হতে ও নতুন ভাবে সদর্থক ভাবনা এবং শক্তি প্রদান করে জীবনের সম্মুখীন হতে সাহায্য করেছে।
সুষমা গোয়েল (গৃহকর্ত্রী) তার অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেছেন, “জীবনের ছোট ছোট ঘটনায় আমি সর্বদাই শঙ্কিত এবং উদ্বিগ্ন থাকতাম। প্রতিটি ছোট বা বড় ঘটনায় আমি বিচলিত হয়ে যেতাম। আমার স্বামী আমাকে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া স্থির করেন এবং চিকিৎসক বলেন আমি সাধারণ উদ্বেগজনিত ব্যাধিতে ভুগছি। আমার চিকিৎসা শুরু হয়, তার সাথে আমি 6 মাস ধরে প্রতিদিন যোগা এবং ধ্যান করে চলি। আজ অনুভব করছি আমি একটি নতুন জীবন পেয়েছি। আমার চিন্তাধারা পরিবর্তিত হয়েছে , আমি ভেতর থেকে অনেক স্থিতিশীল হয়েছি এবং আমার এই আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে,যা ঘটবে তা ভালোর জন্যই ঘটবে। আমি ভবিষ্যত নিয়ে আর ভীত নই , যোগা আমাকে এই শক্তি দিয়েছে।”
সুষমার মতো আপনিও যোগার মাধ্যমে ভয়কে জয় করে সদর্থক জীবনকে আহ্বান করতে পারেন।
এই যোগাসনের পদ্ধতিগুলি অস্থির মনকে শান্ত করতে এবং স্বাভাবিকভাবে মানসিক দুশ্চিন্তার চিকিৎসায় সহায়ক হতে পারে।
উদ্বিগ্নতাকে দূর করার জন্য ষোগের নয়টি পরামর্শ
- যোগাসন করে আপনি মনের দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত হোন।
- প্রাণায়ামের সাহায্যে সঠিক পদ্ধতিতে শ্বাস গ্রহণ করে আশঙ্কা থেকে অব্যাহতি পান।
- ধ্যানের মাধ্যমে নিরুদ্বেগ মনকে উপভোগ করুন।
- যোগ দর্শনকে জীবনে প্রয়োগ করে আনন্দিত থাকুন ও প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করুন।
- প্রার্থনা করুন, বিশ্বাস স্থাপন করুন এবং খুশী থাকুন।
- অপরের জন্য আপনি কি করতে পারেন তা ভাবুন।
- জগতের অনিত্যতা সম্বন্ধে জানুন।
- অতীতের কোন উদ্বেগপূর্ণ অভিজ্ঞতাকে স্মরণ করুন যেটিকে আপনি অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছেন।
- সদর্থক ভাবনাকারীদের সাহচর্যে থাকুন।
1. যোগাসন করে মনের উদ্বেগ দূর করুন
এই যোগের ভঙ্গিগুলির মাধ্যমে আপনি আনন্দপূর্ণ মন ও সুস্থ শরীর প্রাপ্ত করবেন, আসনগুলি আশঙ্কা ও নেতিবাচক ভাবনা থেকে অব্যাহতি দেবে।
- ধনুরাসন
- মৎসাসন
- জানুশীর্ষাসন
- সেতু বন্ধাসন
- মার্জারি আসন
- পশ্চিমোত্তোনাসন
- হস্তপদাসন
- অধোমুখশ্বনাসন
- শীর্ষাসন
- শবাসন
বিঃ দ্রঃ – যোগাসনের শেষে, মন এবং শরীরকে বিশ্রাম প্রদানের জন্য আপনি যোগ নিদ্রায় শায়িত হবেন। এই পদ্ধতি শরীরের ভিতরের বিষাক্ত পদার্থকে নিষ্কাশিত করে, যেটি শরীরের গ্লানির প্রথম কারণ।
2. উৎকন্ঠা দূর করার জন্য প্রাণায়ামের মাধ্যমে সঠিক পদ্ধতিতে শ্বাস নিন
সতর্কতার সঙ্গে শ্বাস গ্রহণ করলে অযাচিত চিন্তা, যেগুলি উদ্বেগের কারণ, সেগুলিকে মন থেকে দূর করে। নিম্নে উল্লেখিত এই শ্বাসের প্রক্রিয়াগুলিকে অভ্যাস করার চেষ্টা করুন।
- কপালভাতি প্রাণায়াম
- ভস্তৃকা প্রাণায়াম
- নাড়িশোধন প্রাণায়াম
- ভ্রামরি প্রাণায়াম
3. মনের প্রশান্তি উপভোগ করার জন্য ধ্যান করুন
বিক্ষিপ্ত মনকে স্থির ও শান্তিপূর্ণ করার জন্য ধ্যান একটি অসাধারণ প্রক্রিয়া। প্রত্যহ ধ্যানের অভ্যাস আপনার চারিপাশে ছোট ছোট ঘটনাগুলির দ্বারা আপনি কিভাবে প্রভাবিত হচ্ছেন সেগুলি সম্পর্কে সতর্কতা জাগাবে। অযথা অত্যাধিক উদ্বিগ্ন হওয়া এবং ভবিষ্যতে কি হবে এই আশঙ্কা থেকে মুক্ত হতেও ধ্যান সাহায্য করে। মানসিক চাপ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ধ্যান শিখুন।
আপনি হয়তো কখনো adrenaline rush (সংকট কালীন হরমোনের স্রোত) শব্দটি শুনে থাকবেন। যখন কোন সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কায় আমরা অত্যন্ত আশঙ্কিত হয়ে পড়ি তখন অ্যাড্রিনালাইন গ্রন্থির নিঃসরণ বৃদ্ধি পায়। উদাহরণ স্বরূপ, – যখন আমরা কোন দুঃসাহসিক যাত্রায় সামিল হই তখন আমাদের অ্যাড্রিনালাইন গ্রন্থির নিঃসরণ বেড়ে যায়, আমাদের হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি পায়, পেশীগুলিকে উত্তেজিত করে তোলে এবং আমাদের শরীর অতিরিক্ত মাত্রায় ঘর্মাক্ত হতে থাকে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে প্রতিদিনের ধ্যানের অভ্যাস এই গ্রন্থির নিঃসরণকে উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস করতে পারে।
4. যোগের দর্শনকে জীবনে প্রয়োগ করুন এবং প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করুন
প্রাচীন যোগের জ্ঞান সম্পর্কে অবগত হওয়া, উচিত – যেগুলি যোগের খুব সাধারণ অথচ গভীর নীতির কথা বলে – যম এবং নিয়ম। প্রাত্যহিক জীবনে সেগুলির প্রয়োগ সুস্থ ও আনন্দিত থাকার রহস্য হতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ: সন্তোষ প্রিন্সিপাল (নিয়ম) আমাদের তৃপ্ত হতে শেখায়। অপরিগ্রহ নীতিটি আমাদের অতিরিক্ত চাহিদার প্রতি যে লোভ বা ইচ্ছা সেগুলিকে জয় করতে শিক্ষা দেয়, শৌচ নীতি, যেটি মন ও শরীরের পরিচ্ছন্নতার কথা বলে, আপনি যদি সংক্রামক ব্যাধির জন্য খুব আতঙ্কিত থাকেন তাহলে এই নীতি অবশ্যই আপনার সহায়ক হবে। যম এবং নিয়ম আমাদের স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ ও সুস্থ জীবন যাপন করতে সহায়তা করে এবং উল্লেখযোগ্য ভাবে মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কম করে।
যোগ দর্শন বোঝার জন্য আপনি গুরুদেব শ্রী শ্রী রবিশঙ্করের পতঞ্জলি যোগসূত্রের ব্যাখ্যা পাঠ করতে পারেন।
5. প্রার্থনা করুন, বিশ্বাস স্থাপন করুন এবং খুশী থাকুন
প্রার্থনা আপনাকে উদ্বেগহীন রাখতে নিশ্চিত ভাবে সহায়ক হবে। প্রতিদিনের প্রার্থনা, স্তব করা অথবা ভক্তিমূলক গান গাওয়া আপনাকে সদর্থক শক্তিতে ভরপুর রাখে এবং মনকে স্থির রাখতে সাহায্য করে। এগুলি আপনার মধ্যে এরকম গভীর বিশ্বাসের জন্ম দেয় যে যা ঘটে তা সবসময় ভালোর জন্যই ঘটে এবং এক ঐশ্বরিক শক্তি আমাদের মধ্যে রয়েছেন যিনি আমাদের তত্ত্বাবধায়ক। তদুপরি, সচেতনতার সাথে অধিক মাত্রায় খুশি থাকার চেষ্টা করুন। এটি অচিরেই আত্মবিশ্বাস বাড়াবে, স্থির রাখবে এবং সদর্থকতার বৃদ্ধি ঘটাবে। শীঘ্রই আপনি এটি চেষ্টা করুন।
6. আপনি অপরের জন্য কি করতে পারেন তা ভাবুন
যখন আমরা সবসময় কেবল নিজেদের নিয়ে ভাবতে থাকি তখনই মানসিক চাপ ও উৎকন্ঠা বৃদ্ধি পায়। “আমাদের কি হবে ?” – এই চিন্তা করে আশঙ্কিত হই। এরচেয়ে, আপনার চারপাশে যারা রয়েছেন তাদের জন্য আপনি কি করতে পারেন সেদিকে মনঃসংযোগ করুন। সামাজিক কিছু কর্তব্যের জন্য নিজেকে উৎসাহিত করে তুললে আপনি গভীর সন্তোষ এবং আনন্দ উপলব্ধি করবেন।
7. জগতের অনিত্যতাকে উপলব্ধি করুন
আমাদের চতুর্দিকে যা আছে সবই অস্থায়ী এবং পরিবর্তনশীল – এই অনুভূতি আপনাকে অন্তঃস্থল থেকে শান্ত ও স্থিত করবে। ‘ এটিও চলে যাবে এবং চিরতরে থাকবেনা’ – এই অনুভূতি আমাদের মধ্যে জাগ্রত হয়ে উদ্বেগের বন্ধন থেকে মুক্তি ঘটাবে। ধ্যান আমাদের মধ্যে এই নীতিগুলি উদ্ঘাটন করতে সাহায্য করে।
8. অতীতের একটি অনুরূপ পরিস্থিতি মনে করুন যেখানে আপনি আপনার উদ্বেগকে জয় করতে পেরেছেন
এটি আপনাকে বর্তমান পরিস্থিতিকেও অতিক্রম করতে ভরপুর শক্তি প্রদান করবে। আপনি মাঝে মাঝেই একথা স্মৃতিতে আনুন।
9. আপনার আশেপাশের একটি সদর্থক সংসর্গে থাকুন
আপনি যখন সদর্থক মনোভাব সম্পন্ন মানুষের সান্নিধ্যে থাকবেন, আপনিও একই চিন্তাধারায় প্রভাবিত হবেন, যেটি আপনার সমগ্র জীবনের দৃষ্টিভঙ্গির উপর প্রতিবিম্বিত হবে। একটি সদর্থক মানসিকতাই আনন্দ, শান্তি এবং পূর্ণ বিশ্রাম দিতে সক্ষম।
ডঃ সেজল শা’ র (শ্রী শ্রী যোগা শিক্ষিকা) তথ্যের উপর ভিত্তি করে শ্রীমতী প্রীতিকা নায়ার এই প্রবন্ধটি লিখেছেন।





